
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যে সংস্কারের আকাঙ্খা তৈরি হয়েছিল তাঁর উপরে ভিত্তি করে গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশকিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর অংশ হিসেবে শ্বেতপত্র কমিটি, বিভিন্ন বিশেষ খাতে সংস্কার কমিশন ও টাস্কফোর্স এবং একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার প্রস্তাবিত কিছু কিছু সুপারিশ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে জাতীয় সংসদে এইসব সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আমরা কিছু বিতর্ক লক্ষ্য করছি। কিন্তু সার্বিকভাবে সংস্কারের অগ্রগতি লক্ষ্য রাখার জন্য নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ শিরোনামে একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছিল। তারই অংশ হিসেবে জনগণকে এইসব সংস্কারের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত রাখার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার নামে একটি ওয়াবসাইট তৈরি করে। এই ওইয়েবসাইটে বিভিন্ন সংস্কার খাতের পাশাপাশি গণমাধ্যম সংস্কারেরও অগ্রগতিও পদ্ধতিগতভাবে ট্র্যাক, পরিবীক্ষণ ও প্রচার করা হচ্ছে। এই কার্যক্রমকে আরো সংহত ও কার্যকর করতে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে কাজ করা শুরু করেছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ ঢাকার ইআরএফ এর কার্যালয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এবং ইআরএফ এর যৌথ উদ্যোগে “বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার: গণমাধ্যমের প্রাসঙ্গিকতা ” শীর্ষক একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এবং ইআরএফ-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ এর সভাপতি দৌলত আকতার মালা। আলোচনার শুরুতে তিনি ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ উদ্যোগের জন্য নাগরিক প্ল্যাটফর্মকে সাধুবাদ জানান। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা বরাবরই বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। কিন্তু সেগুলো থাকে বিচ্ছিন্নভাবে। তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে সব তথ্য একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা আমাদের জন্য বড় সুযোগ। বিশেষ করে এই যৌথ উদ্যোগের ফলে তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকদেরও এই কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আমি আশাবাদী। গণমধ্যামের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত সময়ে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আমাদের স্বচ্ছতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, কারণ স্বচ্ছতা ছাড়া প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়। আর এই স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মতো উদ্যোগ অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য রাখেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য । তিনি বলেন, মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন যেমন অপরিহার্য; অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতেও সংস্কার তেমনি অপরিহার্য। অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে সংস্কার প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে হবে। এই প্রক্রিয়া থেমে গেলে অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে সংস্কারের ইতিহাস ও ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছে, তার মধ্য দিয়ে সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা আরও জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামগ্রিক কাঠামোগত উন্নয়নের জন্যও সংস্কার অপরিহার্য। তবে, এই সংস্কারকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখনকার মূল চ্যালেঞ্জ। এই কারণেই নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে আমরা রিফর্ম ট্র্যাকার তৈরি করেছি। যেহেতু সংস্কারের অগ্রগতির সাথে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তাই আমরা একই সাথে নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করতে ‘ম্যানিফেস্টো ওয়াচ’-এর উদ্যোগও গ্রহণ করেছি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি, এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, সংস্কারের মাধ্যমেই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব এবং সরকার তার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। তিনি নির্যাতিত সাংবাদিকদের প্রতিকার নিশ্চিতে একটি স্থায়ী কাঠামো গঠন এবং অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের ভাতার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান। গণমাধ্যমের আধুনিকায়নে সব অংশীজনকে নিয়ে একটি যুগোপযোগী বিজ্ঞাপন নীতিমালা প্রণয়ন এবং সার্কুলেশন সংক্রান্ত অসত্য তথ্য বন্ধের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি সরকারকে সঠিক পথে চলতে সহায়তা করবে। এছাড়া তিনি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানান যে, এরই মধ্যে মালিক পক্ষ ও সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তথ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিজ নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী, সিপিডি। প্রথমেই তিনি রিফর্ম ট্র্যাকারের কার্যপদ্ধতি ও উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই ট্র্যাকারটির মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। একটি সংস্কারের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ধাপ- প্রস্তাবনা, উদ্যোগ গ্রহণ, আইনি রূপরেখা, কার্যকরীকরণ এবং চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত তথ্য ট্র্যাকারে হালনাগাদ করা হবে। ট্র্যাকারটির মূল লক্ষ্য হলো তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা। তিনি আরও জানান যে বর্তমানে এটি দুর্নীতি দমন, নির্বাচন ব্যবস্থা, শ্রম এবং গণমাধ্যম সংস্কারের মতো বিষয়গুলো ট্র্যাক করছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে বিচার বিভাগ ও নারী অধিকারসহ আরও অন্যান্য খাত এই তালিকায় যুক্ত হবে।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন নিউজ ম্যানেজমেন্ট জনাব শওকত হোসেন । তিনি বলেন, আমরা যারা নব্বইয়ের পরে সাংবাদিকতা শুরু করেছি তারা সংস্কার শব্দটার সাথে খুব বেশী পরিচিত। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী জনাব সাইফুর রহমান সাহেব আর তারপরে শাহ এ এম এস কিবরিয়া সাহেবের সময়ে সংস্কার নিয়ে এক ধরণের ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ছিল। তবে ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেন (১/১১) এর পরে সংস্কার শব্দটা বলতেও মানুষ ভয় পেত। সেই সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা ২০২৪ এ ফিরে এসেছে। রিফর্ম ট্র্যাকার নিয়ে আলোচনাকালে তিনি সংস্কারের গতিবিধি দেখার পাশাপাশি এসব সংস্কারের প্রভাব বিশ্লেষণে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বা মেন্টরশিপ গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
সম্মানিত আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক জনাব শামসুল হক জাহিদ । তাঁর বক্তব্যে তিনি গণমাধ্যমের সংস্কার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো দৃশ্যমান বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যায়নি। আমি নিজে এই কমিশনের সদস্য হওয়ায় বিষয়টি আমাকে আরও বেশি হতাশ করেছে। দেশের সংবাদপত্র শিল্পের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি বিটিভি এবং বাংলাদেশ বেতারের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত এবং যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে গণমাধ্যমের কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন নিশ্চিত হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দ্য নিউ এজ-এর সম্পাদক জনাব নূরুল কবির। তিনি সাংবাদিকতার বর্তমান গতিধারা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, বর্তমানে দুই ধরনের সাংবাদিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি লিপ্ততার আর অন্যটি নির্লিপ্ততার। আমাদের অবশ্যই লিপ্ততার সাংবাদিকতা বেছে নিতে হবে, যেখানে সাংবাদিকরা সব ধরনের অনিয়ম, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবেন। তিনি আরও বলেন, জাতির যেকোনো সংকটকালে সাংবাদিকদের বিশেষ ভূমিকা বা অ্যাকটিভিজম প্রয়োজন হয়। তবে আমাদের সজাগ থাকতে হবে, এই অ্যাকটিভিজম যেন কোনোভাবেই দলীয়করণের বৃত্তে বন্দি না হয়। সাংবাদিকতার প্রতিকূলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্যদের যেমন পাবলিক ইনফরমেশন বা জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশে সীমাবদ্ধতা থাকে, তেমনি সাংবাদিকদের ওপরও তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই প্রতিকূল পরিবেশে সাংবাদিকতা করতে হলে আমাদের অবশ্যই লিপ্ততার সাংবাদিকতার ওপরই জোর দিতে হবে।
অনুষ্ঠানের শেষে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন ইআরএফ-এর সাধারণ সম্পাদক জনাব আবুল কাশেম।
Leave A Comment