
জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা নয়, এটি নির্ধারণ করে উন্নয়নের সুফল কারা পাবে এবং কারা পিছিয়ে থাকবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ঘিরে আলোচনায় তাই অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে সমাজের প্রান্তিক ও অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের বাস্তবতা। নীতিগতভাবে বাজেটটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বহন করলেও এর আর্থিক কাঠামো, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে এসেছে। মূল্যস্ফীতি, সীমিত কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সেবাপ্রাপ্তির বৈষম্যের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবার, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, হিজড়া সম্প্রদায়, কৃষিশ্রমিক ও ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও বহু ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ, বাস্তবায়ন কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়, বাজেট কি সত্যিই ‘কাউকে পেছনে না রাখা’র প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে, নাকি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আবারও উন্নয়নের আলোচনায় উপস্থিত থেকেও সুবিধা বণ্টনের বাইরে রয়ে যাবে।
এসব আলোচনা উঠে আসে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম কর্তৃক ১৫ জুন ২০২৬ তারিখ ঢাকায় আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে। মিডিয়া ব্রিফিংয়ে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেন।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-র সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মিডিয়া ব্রিফিংটির সভাপতিত্ব করেন। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ এর মূল দর্শনের ‘কাউকে পেছনে না রাখা’-র প্রেক্ষিত থেকে বাজেটকে বিশ্লেষণ করাই এই আলোচনার মূল বিশেষত্ব। বর্তমান সরকারও একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ার কথা বলছেন, যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন থাকবে। তাই সম্পদ, আয় ও ভোগের পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে সমাজে যারা প্রান্তিক মানুষ আছেন, তাদের জন্য বাজেটে কী আছে এবং বাজেটের বিভিন্ন অভিঘাত তাদের ওপর কেমন পড়বে, তা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপস্থিত সম্মানিত আলোচকবৃন্দ যারা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কাজ করেন, তাঁরা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে এই বাজেটকে বিশ্লেষণ করবেন।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-র সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এবারের বাজেটের নীতি কাঠামোটি প্রাগ্রসর এবং চিন্তাশীল হলেও তা অত্যন্ত অনগ্রসর, দুর্বল এবং অকার্যকর আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান অভাব এবং সঞ্চয় হারানো- এই ত্রিমুখী চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক প্রশাসনে সুনির্দিষ্ট সংস্কারের ওপর জোর দেন। একই সাথে তিনি পূর্ববর্তী সরকারের মতো প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়ে বলা বা মূল্যস্ফীতি কম দেখানোর মতো তথ্য-উপাত্তের ‘ছলচাতুরি’র প্রবণতা থেকে বর্তমান সরকারকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাজেট প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের বিষয়েও জোর দেন। ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী অর্থমন্ত্রীকে প্রতি ৩ মাস পর পর সংসদে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবৃতি প্রকাশের সুপারিশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে সংসদে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য একটি সর্বদলীয় ‘পার্লামেন্টারি ককাস’ গঠনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য ঘোষিত নীতিগুলোর বাস্তব অগ্রগতি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নজরদারীতে রাখা হবে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পরে সম্মানিত আলোচকবৃন্দ তাঁদের বক্তব্য ও খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান নতুন সরকারের প্রথম বছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলে অভিহিত করেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অসংগতিগুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্রের অভাব আছে। তিনি আরও বলেন, তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না দেখে আগের সরকারের নথিপত্র ব্যবহারের যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা বাজেট প্রণয়নে পেশাদারিত্বের ঘাটতিকেই নির্দেশ করে।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস-এর পরিচালক ও কর বিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া করের প্রায়োগিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করেন। করমুক্ত আয় সীমা বৃদ্ধি এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের আয়ে কর ছাড়ের সিদ্ধান্তকে প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে তিনি সতর্ক করেন যে, ১৫ শতাংশ ভ্যাটের উচ্চ হারের কারণে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সাধারণ ভোক্তার ওপরই করের চূড়ান্ত চাপ পড়বে। এছাড়া শিল্পায়নের স্বার্থে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ আগামী ৩-৪ বছরে কর্মসংস্থান বাড়াতে সুফল দেবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি। তিনি আরও বলেন, পদ্ধতিগত সংস্কার ছাড়া টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক করলে কর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার অভাবে অর্থ ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল তাঁর বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরেন। তিনি স্বাস্থ্য খাতের বাজেট প্রায় দ্বিগুণ করা এবং চিকিৎসাকেন্দ্রিক (curative) সেবা থেকে প্রতিরোধমূলক (preventive) সেবার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তবে হাসপাতালগুলোর জেলাভিত্তিক প্রকৃত চাহিদার পরিবর্তে প্রচলিত পদ্ধতিতে শয্যা সংখ্যার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়ার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া বড় ধরনের রোগের চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু ‘হেলথ কার্ড’ বা প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নয়, বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার পদ্ধতিগত সংস্কার এবং প্রান্তিক ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি চিকিৎসকদের আচরণগত সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ, হেড অব পলিসি অ্যাডভোকেসি, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ। তিনি বাজেটে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতি নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH) খাতের বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা করেন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জনপরিসরে বিনামূল্যে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বাজেটে জলাধার সংরক্ষণের মতো কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য কোনো সুস্পষ্ট প্রকল্প নেই। তিনি বলেন, কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সদিচ্ছা থাকলেও কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতা ছাড়া এ বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম চলপড়ি’র প্রতিষ্ঠাতা জারিন মাহমুদ হোসেন শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রশংসা করলেও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং গুণগত শিক্ষার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু কম্পিউটার বা ল্যাপটপ সরবরাহ করলেই ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। অধিকাংশ স্কুলেই বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়াও প্রশিক্ষণের অভাবে বিভিন্ন সরঞ্জাম অনেক সময় অব্যবহৃত পড়ে থাকে। তাই শিক্ষকদের জন্য সাত বছর পর পর নামমাত্র প্রশিক্ষণের পরিবর্তে নিয়মিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণের ওপর তিনি জোর দেন। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।স
এডুকো বাংলাদেশ-এর হেড অব প্রোগ্রাম তাজিন হোসেন শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধির প্রশংসা করেন। তিনি একইসাথে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক শিশুদের সুরক্ষায় নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জানান। তিনি শতভাগ এনরোলমেন্টের তথ্যগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, প্রায় ৩৬ লাখ শ্রমজীবী, চা-শ্রমিক ও পথশিশু এখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে, যাদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা বাজেটে নেই। এছাড়া শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি থাকলেও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট হ্রাস পাওয়া এবং তৃণমূল ও গার্মেন্টস কর্মীদের উপযোগী ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, ২০টিরও বেশি মন্ত্রণালয় শিশুদের জন্য বরাদ্দ রাখলেও নির্দিষ্ট কোনো সমন্বিত কাঠামো না থাকায় শিশুরা এখনো অনেকাংশে অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জ্বালানি খাতের অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প এবং নীতিগত ত্রুটির কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভুল পরিকল্পনার ফলে সৃষ্ট বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝাই এ খাতের অন্যতম প্রধান সংকট। চলতি বাজেটে যার কোনো সমাধান অনুপস্থিত। রান্নার জ্বালানির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব এবং এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নতুন করে কর আরোপের সমালোচনা করেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এ খাতে ভর্তুকি প্রদানেরও দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, সোলার ইরিগেশনের মতো টেকসই মডেলগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে লোকসানমুখী কাঠামো থেকে বের করে সুশাসন ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মাধ্যমে একটি কার্যকর ও বাণিজ্যিকভাবে টেকসই খাতে রূপান্তর করা জরুরি।
উইম্যান উইথ ডিজএ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ)-এর নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি বৃদ্ধিকে স্বাগত জানান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্থায়ীভাবে ভাতা-নির্ভর না করে তাদের কর্মক্ষমতা অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবী জানান তিনি। নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার কথা বলা হলেও বিদ্যালয়গুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী নয় বলে মতামত দেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যাতায়াত ও সহায়ক উপকরণের উচ্চ ব্যয়ের তুলনায় উপবৃত্তির পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক যন্ত্রেগুলোর ওপর করছাড় না থাকায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আরও বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বাজেটে ভূমি প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের আদালতগুলোর প্রায় ৭৫–৭৭ শতাংশ মামলা ভূমিকেন্দ্রিক এবং নারীর বিরুদ্ধে ৫০–৫৫ শতাংশ সহিংসতার মূল কারণ ভূমি ও সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তারপরও বাজেটে ভূমি দুর্নীতি দমনে কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়নি। এছাড়া মোট কৃষি শ্রমের অর্ধেক নারী হলেও তাদের উৎপাদনশীল সম্পদ ও ভূমির ওপর অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বাজেট পাসের আগেই ভূমি প্রশাসনের সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি সম্পূরক প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে দাবি জানান।

মানবাধিকারকর্মী ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ইলিরা দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাহাড়ে হাজার কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণ বা পর্যটন শিল্পের মতো বড় প্রকল্পে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতির কারণে ডিজিটাল শিক্ষা বাস্তবসম্মত হচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্থিতিশীল করতে স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা এবং নতুন নীতিগত কাঠামোর মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফরিদ উদ্দিন খান বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়া এবং কৃষকদের জীবনযাত্রার সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হওয়া সত্ত্বেও এবারের বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উত্তরবঙ্গে আম চাষের মতো কৃষি কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে আদিবাসী শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে এবং তীব্র মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সারের জন্য বরাদ্দকৃত ১৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল এবং এতে ভবিষ্যতে সারের দাম বাড়তে পারে। কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি ও অন্যান্য দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দিতে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির কমিউনিটি প্যারালিগাল রামিসা চৌধুরী বাজেটে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার অধিকার সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, সংবিধানে সমান অধিকারের কথা থাকলেও হিজড়া জনগোষ্ঠী শিক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জটিলতা, ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্তি এবং কর্মসংস্থানে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে পুলিশ বা আনসারে নিয়োগ এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। এছাড়াও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার এবং তাদের কর্মসংস্থানে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য করছাড় সুবিধা আরও কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
ব্রিফিংয়ে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর সাবেক সভাপতি ও ইটিবিএল সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান রাহমান। কর ছাড়ের মতো সীমিত প্রণোদনার পরিবর্তে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা আরোপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া, রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ ঢাকা এবং মোট ৯৬ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসায় করের বোঝা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের ওপর অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে করের আওতা সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও চাপের বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন। এডিপি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব ও উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে অর্জন সম্ভব হবে না বলেও মত দেন তিনি।
নাগরিক উদ্যোগ-এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, এসডিজির মূল মন্ত্র ‘কাউকে পেছনে না রাখা’ বাস্তবায়নে গত ১৫ বছরেও সরকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বা ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণে কোনো বিস্তৃত জরিপ পরিচালনা করেনি। এছাড়া, সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের ৪৩ শতাংশ সরকারি পেনশন ও কৃষি খাতে ব্যয় হওয়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফ্যামিলি কার্ডের মতো কিছু কর্মসূচি থাকলেও দলিত বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো পৃথক বরাদ্দ নেই। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জেন্ডার, জলবায়ু ও জাতিগত বৈচিত্র্যের মতো কাঠামোগত সংকটসমূহের বিবেচনায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করলে সামাজিক সমতা ও টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়।
দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাজেটের রাজনৈতিক বা জনতুষ্টিমূলক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ এবং তার কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এছাড়া বাজেট প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।
ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের পাইলটিংকে ‘নন-লার্নিং ওরিয়েন্টেড’ আখ্যা দেন। জবাবদিহিতা নিশ্চিতের নাম দিয়ে ঢালাও ডিজিটালাইজেশন সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সংকুচিত করছে এবং জবাবদিহিতা এড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। স্থানীয় প্রশাসনের সংস্কার এবং জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি বলে মত দেন তিনি।
আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন ফারাহ্ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ। বাজেটে জেন্ডার ও জলবায়ু বরাদ্দের নেতিবাচক প্রবণতা এবং প্রান্তিক নারীদের অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় জেন্ডার বাজেটের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এছাড়াও ফ্যামিলি কার্ডের বিতরণ ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। এছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাত, বিশেষ করে নির্মাণ শিল্পে নারী শ্রমিকদের চরম মজুরি বৈষম্য দূর করতে একটি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি করেন। তিনি বলেন, জলবায়ু বাজেট কেবল অবকাঠামোকেন্দ্রিক না করে উপকূল ও চরাঞ্চলের ভুক্তভোগী নারী, কৃষক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বাজেটের প্রেক্ষিতে মাঠপর্যায়ের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষাক্ষেত্রের বাজেট মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বিনির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। একইসাথে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের করছাড়ের ক্ষেত্রে ফাঁকি রয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া তিনি প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্বল ওয়াশ (WASH) সুবিধা ও অপ্রতুল শৌচাগার ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন। এসব এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিনামূল্যে মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন কিট সরবরাহের দাবি জানান। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক অনুদানসহ সামগ্রিক বাজেটের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন আমলাতন্ত্রের সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করা জরুরি।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ের সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এবং এর দুর্বলতাগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে অংশীজন ও গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং যৌথ বাজেট ট্র্যাকিং অত্যন্ত জরুরি।
উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ বাজেট সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়।
Leave A Comment