২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট শুধু বার্ষিক আর্থিক হিসাবনিকাশ নয়, বরং সদ্য নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে। ক্রমবর্ধমান আর্থিক ও বৈশ্বিক চাপ, সরকারের প্রতিশ্রুতি ও জনমানুষের প্রত্যাশার ত্রিমুখী চাপের মধ্য দিয়ে আগামী জুন মাসে ঘোষিত হবে এই বাজেট। এই প্রেক্ষিতে ১৮ মে ২০২৬ তারিখে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা শীর্ষক একটি প্রাক-বাজেট সংলাপের আয়োজন করে। সংলাপে বিভিন্ন অংশীজন, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় দেশের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা, ক্রমবর্ধমান ঋণচাপ, রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা, মানবসম্পদ উন্নয়নের ঘাটতি এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের সংকটগুলো উঠে আসে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-র সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য  সংলাপটির সভাপতিত্ব করেন। বাজেট বাস্তবসম্মত না হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ আরও সংকুচিত হবে বলে মতামত দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার সাথে অস্থির বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজার সংকট যুক্ত হয়েছে। এর ওপর আছে আইএমএফ (IMF)-এর দেওয়া ঋণের কঠিন ও বাধ্যতামূলক শর্তগুলো। সামগ্রিক অর্থনৈতিক এই চাপের সাথে সরকারের ওপর জনমানুষের প্রত্যাশার চাপও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে জনগণ বাজেটের সুফল পাবে না।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে তুলনা করেন একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সাথে, যাদের বাজার খরচ ও ঋণের বোঝা প্রতিদিন বাড়ছে, কিন্তু পকেটের আয় থমকে আছে। সরকারের জন্য এডিপি’র বাস্তবায়ন ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপকে বাজেটের মূল ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। তিনি আরও বলেন সরকারের ঘোষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দিন দিন অতি-উচ্চাভিলাষী হচ্ছে। কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার না করে প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালে ঘাটতিও আরও বাড়বে। তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জরুরী খাতের বাজেট ছাঁটাই করতে হবে। তিনি বলেন, অভিজাত শ্রেণীকে সুবিধা দেওয়ার ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ বা ঢালাও কর ছাড়ের মতো সুবিধা বন্ধ হওয়া দরকার। এর বদলে ডিজিটাল অর্থনীতিকে করের আওতায় আনা এবং সম্পদ ও উত্তরাধিকার কর আরোপের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনার পরে সংলাপে উপস্থিত অংশীজনদের মধ্যে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে বাজেট সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়। এই জরিপে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশী সম্পত্তি থাকলে সম্পত্তি কর আরোপের প্রস্তাবের প্রতি শক্তিশালী সমর্থন দেখা যায়। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পুনরায় চালুর তীব্র বিরোধিতা করেন অংশগ্রহণকারীরা এবং সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে স্ব-নিবন্ধনের সুযোগ থাকার পক্ষে সমর্থন দেন। তাঁরা সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার পক্ষে এবং ব্যর্থ ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে করের অর্থ বরাদ্দ করার পক্ষে ভোট দেন। তবে দ্রুততার ভিত্তিতে পে-কমিশনের সুপারিশ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের বিপক্ষে অবস্থান করেন অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী। নির্দিষ্ট পরিমাণের ঊর্দ্ধে উত্তারাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ থাকলে তার উপর কর আরোপ করা এবং মোটরসাইকেলকে অগ্রিম আয়করের আওতায় আনার প্রশ্নে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে বিভক্ত মতামত পাওয়া যায়।

জরিপের শেষে সম্মানিত আলোচকগণ তাঁদের বক্তব্য রাখেন। সরকারিভাবে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ার পরও কেনো দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত তলানিতে পড়ে আছে, এই প্রশ্ন করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থার দুর্নীতি ও অকার্যকারিতার কারণে জনগণ যে কর দেয়, তার বড় অংশই রাষ্ট্রের কোষাগারে পৌঁছায় না। বিভিন্ন ডিজিটাল সিস্টেমের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বা interoperability না থাকা এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। তিনি সতর্ক করেন, এর ফলাফল হিসেবে ঋণনির্ভর উন্নয়ন মডেলের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন বরাদ্দের একটা বিশাল অংশ ‘অদৃশ্যভাবে’ অপচয় এবং লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে, দেশ থেকে ক্রমাগত বিদেশে অর্থ পাচার হওয়াকে তিনি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। সরকারি জিডিপি ও ঋণের হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ওপর নাগরিকের আস্থা পুরোপুরি না ফিরলে কোনো বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে না।

বাজেট শুধু কাগজে বাড়ালেই হবে না, এর বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চান ব্যবসায়ীরা। প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেএমইএ-এর প্রাক্তন সভাপতি মো. ফজলুল হক  শিল্প খাতের তীব্র সংকটের কথা তুলে ধরেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, ব্যাংক ঋণের লাগামহীন সুদহার এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের তরুণ প্রজন্মের ওপর বিনিয়োগের ঘাটতির প্রভাব নিয়ে কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতের বিচ্ছিন্নতার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আর শ্রমবাজারের মধ্যে কোনো সংযোগ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও বাজারের উপযোগী বাস্তব দক্ষতার তীব্র ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

ডিজিটালাইজেশনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ। তিনি সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’ (DSRS)-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের ডাটাবেস ব্যবস্থাপনা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উন্নত পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

সংলাপে অংশ নেওয়া সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সমস্যাসমূহ এবং সংস্কারের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলো নিয়ে তুলনামূলক ও ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে।

অর্থনীতির সামষ্টিক ও কৌশলগত সংকটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মাননীয় সংসদ সদস্য মোঃ সাইফুল আলম, এমপি। তিনি বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে করনীতিতে একটি আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন। তিনি গতানুগতিক কর আদায়ের সমালোচনা করে প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতাভিত্তিক একটি প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন। একই সাথে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌর শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে তরুণদের বাস্তবমুখী দক্ষতাবর্ধনে আগামী বাজেটে বিশেষ থোক বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।

মাননীয় সংসদ সদস্য মাহ্‌মুদা হাবীবা, এমপি, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। তিনি সরকার প্রণীত ‘ফ্যামিলি কার্ড’-সহ অন্যান্য কার্ডের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল ‘স্ব-নিবন্ধন’ ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাবনাকে সাধুবাদ জানান। তিনি তাঁর বক্তব্যে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং বাজেটে নাগরিক প্রত্যাশার প্রতিফলন হবে বলেও আশ্বাস দেন।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আবু জাফর মোঃ জাহিদ হোসেন, এমপি। তিনি বলেন, সমাজকল্যাণ বা নারী ও শিশু উন্নয়নকে বাজেটের দয়া-দাক্ষিণ্যের কোনো ‘আলাদা খাত’ হিসেবে না দেখে একীভূত মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। সামাজিক খাতে ব্যয়ের অর্থকে কোনো অনুদান বা খরচ হিসেবে না দেখে দেশের ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন। সামাজিক সুরক্ষার চলমান প্রকল্পগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল ছাড়া সরাসরি নাগরিকদের কাছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাতার টাকা বা সুফল পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সংলাপে উপস্থিত নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, যুব সংগঠন, উন্নয়ন সংস্থা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব সংগ্রহ, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি, সামাজিক সুরক্ষা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা এই বিষয়ে একমত পোষণ করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো গতানুগতিক নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত, সংস্কারমুখী ও নাগরিকদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট প্রয়োজন। চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এই আসন্ন বাজেটকে একদিকে যেমন কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে, তেমনি অন্যদিকে সামাজিক অগ্রাধিকার রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে।