
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ, ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি নাগরিক ইশতেহার প্রস্তুত করেছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ন্যায্য, সমতাভিত্তিক ও জবাবদিহিপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে এই ইশতেহারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন নীতি ও বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচির প্রস্তাব করা হয়েছে। নাগরিক ইশতেহার প্রস্তুতির প্রক্রিয়ায় দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে পরামর্শ সভা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ১৫টি যুব কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে ৩৫টি জেলার প্রায় ১,৫০০ জন স্থানীয় অংশীজন ও যুবদের মতামত ও সুপারিশ সংগ্রহ করা হয়েছে। সাথে আরো যুক্ত ছিল নাগরিক প্ল্যাটফর্মের জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের ১৫০টিরও বেশী সহযোগী সংগঠন।
নাগরিক ইশতেহারের সুপারিশসমূহ আগামী দিনে রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচনী ইশতেহারে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে এই প্রত্যাশায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ ঢাকায়– জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা শীর্ষক একটি আলোচনার আয়োজন করা হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনের জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে এই সংলাপে নাগরিক ইশতেহার ও নির্বাচনী ভাবনা উপস্থাপন করা হয়।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আহ্বায়ক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এবং সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) সংলাপের সভাপতিত্ব করেন। নাগরিক ইশতেহারটি উপস্থাপন করবার আগে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশ রাষ্ট্র সংস্কারের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিচার, নির্বাচন, সংস্কার ও নাগরিক অধিকার–এ চারটি বিষয়ে আলোচনার মুখ্য তাগিদ আমরা অনুভব করি। এগুলোকে সামনে রেখে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন, এই নির্বাচনে কার কথা স্থান পাবে? নির্বাচন কি সুষ্ঠু হবে? ইশতেহার-এ কি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা স্থান পাবে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া বিপন্ন জনগোষ্ঠী এবং দেশের নারীসমাজ আগামী দিনের রাষ্ট্রচিন্তার ভেতরে স্থান করে নিতে পারবে কিনা।
তিনি দেশব্যাপী আঞ্চলিক পরামর্শ সভা ও যুব কর্মশালাগুলোর ফলাফল উপস্থাপন করেন। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যুব এবং নাগরিকদের ভাবনাগুলো ওয়ার্ড ক্লাউডের মাধ্যমে দেখানো হয়। পরামর্শসভাগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে ড. দেবপ্রিয় বলেন আঞ্চলিক সমস্যাসমূহের সাথে সাথে দেশব্যাপী সুশাসন, স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা, আইনের শাসন, মানসম্মত নাগরিক পরিষেবার বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে উঠে এসেছে। একই সাথে জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রত্যাশাও আলোচনাগুলোতে উঠে এসেছে। তিনি আরও বলেন, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যেন সংস্কারের ধারা অব্যাহত রাখে সেই উদ্দেশ্যেই নাগরিক প্ল্যাটফর্ম একটি রিফর্ম ট্র্যাকার প্রস্তুত করেছে।
আলোচনার এই পর্যায়ে মেন্টিমিটারের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা ‘পরবর্তী সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা কী?’ এই প্রশ্নের উত্তর দেন। সেখানে নিরাপত্তা, সুশাসন, আদিবাসীদের স্বীকৃতি, জবাবদিহিতা, সুশিক্ষা, দলিত সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয় উঠে আসে। মুক্ত আলোচনায় চা শ্রমিকের ভূমির অধিকার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ভাসমান জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা, জলবায়ুর কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী, খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যের মান, হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমুহের নিরাপত্তা, ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করেন।
অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি, এই সংলাপে বিশেষ মন্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, যারাই নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসতে চাইছে, তাদের এ বিষয়ে ভালোভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ, মানুষ এখন একটু অধৈর্য হয়ে আছে। শুধু আশ্বাসে অত বিশ্বাস করতে চাইছে না, মানুষকে দৃশ্যমান কিছু কাজ দেখাতে হবে। নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সরকারকে ১০০ দিনের কর্মসূচি দিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে বলেও মতামত দেন তিনি। উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজেদের ভেতর কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে তার উপরে। তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে যে দলই সরকার গঠন করুক, নাগরিক সমাজ যেন নির্বাচনের পরেও নিজেদের কাজ নির্ভয়ে করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংলাপে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জনাব সুব্রত চৌধুরী বলেন, বছরের পর বছর ধরে দেশে নীতিবিহীন রাজনীতি চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার না হলে দেশেরও সংস্কার হবে না বলেও মতামত দেন তিনি। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ‘ওয়াচ ডগের’ মতো কাজ করতে আহ্বান জানান তিনি।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান জনাব মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও বাজেট রয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে অনেক সময় ডিসি বা এসপিরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন তিনি। কেন নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন হলো না এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি মতামত দেন, নির্বাচনের জোয়ারে সংস্কার আটকে গেছে।
জনাব আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বলেন, সাধারণ মানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রাম দীর্ঘ সময় ধরে কমিউনিস্টরা করে যাচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সম্পর্কে তিনি বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূল নীতি এখানে নেই তাই এই গণভোট অপ্রয়োজনীয়। এটিতে সিপিবি অংশ নেবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতার প্রতি জোর দেন।
রাজনীতিবিদ এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার কাঠামো অত্যন্ত দূর্বল। সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে এমপি পদ থাকে না। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি করলে দুদকের কাছে তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে কিন্তু দুদক চেয়ারম্যানকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিয়োগ দেন। নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন বা বিচার বিভাগ, কোনো ক্ষেত্রেই বর্তমান কাঠামোতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী, বরিশাল জেলা সমন্বয়ক, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বলেন, এর আগে অধিকাংশ এমপি ছিলেন কোটিপতি-ব্যবসায়ী। তারা সংসদকে একটা ক্লাব বানিয়ে লুটপাট করেছেন। এবারও যারা নির্বাচিত হবেন তারা সেই কাঠামোর মধ্যেই থাকবেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাত এবং গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কারের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে বলেও মতামত দেন তিনি। মব সংস্কৃতি এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র জনাব শরীফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি প্রার্থীদের সুরক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) -এর যুগ্ম আহ্বায়ক মিজ নুসরাত তাবাসসুম বলেন, কোনো দেশে যখন বিপ্লব হয় তখন সেই বিপ্লবই সংস্কারের ম্যান্ডেট দিয়ে দেয়। কিন্তু নতুন বন্দোবস্ত কতটা বাস্তবায়িত হলো সেটা নিয়ে গর্ব করে কিছু বলার মতো অবস্থা নেই। আগামী প্রজন্মকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আজকে দুই হাজার টাকায় যে ভোট বিক্রি করবে পরের পাঁচ বছর ধরে তার ভাগের অন্তত দুইশ’ কোটি টাকা স্ট্যাবলিশমেন্টের পকেটে যাবে।
আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব সাইফুল আলম খান মিলন, সদস্য, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তিনি বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা এখন বড় সংকট। তবে ঐক্যমত্য কমিশনের রিপোর্ট গণভোট এবং সংসদে পাশ হলে পরবর্তীতে সেটা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হবে বলেও মতামত দেন তিনি। সংসদের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করার ব্যবস্থার প্রতি জোর দেন তিনি। একই সাথে ঘোষণা দেন জামায়াত থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সরকারি প্লট ব্যবহার করবে না বা ট্যাক্সবিহীন গাড়ি গ্রহণ করবে না। জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে নারীদের নির্বাচনে আনা হবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের জবাবদিহিতার বিষয়ে জোর দেওয়া দরকার। দেশে অনির্বাচিত সরকার থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে জবাবদিহিতা অনুপস্থিত ছিল। গণতন্ত্র গড়ার জন্য সুশীল সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানান তিনি। বলেন, আমাদের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে একটি অংশীদারিত্ব লাগবে। সুশীল সমাজ, এনজিও, বেসরকারি খাতসহ সবাই মিলে সমাধান করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে যারা আমাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ছিল তাদের নিয়েই বিএনপি চলবে। আগামী সরকার সংসদীয় কমিটিগুলোকে সচল করতে পারলে নতুন কোনো বন্দোবস্তের দরকার হবে না বলেও জানান তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, নির্বাচন শুধু সুষ্ঠু হলেই হবে না, নির্বাচনকে অর্থবহ হতে হবে। নতুন বন্দোবস্ত আনতে চাইলে রাজনীতি বদলাতে হবে এবং একইসাথে নাগরিকদের চেতনাও বদলাতে হবে।
Leave A Comment