এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ তার প্রাক-নির্বাচনী উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী আঞ্চলিক পরামর্শ সভার আয়োজন করছে, যার লক্ষ্য হলো নাগরিকদের প্রত্যাশা, উদ্বেগ ও প্রস্তাবগুলো সরাসরি নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তুলে ধরা। এই ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ময়মনসিংহে ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ আয়োজিত আঞ্চলিক পরামর্শ সভাটি ছিল নাগরিক মতামত সংগ্রহ ও সংস্কার ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।

সভায় আলোচনার সূচনা করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “সংস্কার ও নির্বাচন—এই দুই প্রক্রিয়াকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; মূল প্রশ্ন হলো, এই প্রক্রিয়াগুলোর ভেতরে নাগরিকের কণ্ঠ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নাগরিক প্ল্যাটফর্মের নতুন উদ্যোগ Bangladesh Reform Watch একটি নাগরিক-দৃষ্টিকোণভিত্তিক পর্যবেক্ষণ কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে বিচার, প্রশাসন, নির্বাচনসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা হবে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে সংস্কারসংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে পাবলিকলি এভেইলেবল তথ্য ও উপাত্ত একত্র করে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হবে। প্ল্যাটফর্মটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও নজরদারির সুযোগ সৃষ্টি করবে।

নাগরিকদের অগ্রাধিকার: মেন্টিমিটার ফলাফল

সভায় অংশগ্রহণকারীদের মতামত সংগ্রহের জন্য ডিজিটাল মেন্টিমিটার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে উঠে আসে নাগরিকদের শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলো—

  1. সুশাসন

  2. উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার কঠোর মনিটরিং

  3. দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ

  4. দ্রুত, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন

  5. স্থানীয় অবকাঠামোগত দাবি—বিশেষ করে কাচারী ঘাটে সেতু নির্মাণ

এই ফলাফল দেখায় যে নাগরিকরা জাতীয় সংস্কারের প্রশ্নের পাশাপাশি স্থানীয় ও আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।

জাতীয় ইস্যু: নির্বাচন, বিচার ও জবাবদিহিতা

আলোচনায় নাগরিকরা জোর দিয়ে বলেন যে, ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সুশাসনের মূল ভিত্তি। বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা, বিশেষ করে নিম্ন আদালতে ন্যায়বিচার ও ‘এক্সেস টু জাস্টিস’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা প্রশাসনিক দুর্নীতি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার ঘাটতির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। অনেকেই প্রস্তাব দেন যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও অগ্রগতি প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

আঞ্চলিক বাস্তবতা: নাগরিক সেবা, অবহেলা ও বৈষম্য

ময়মনসিংহের চরাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকার নাগরিকরা বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। লিঙ্গবৈচিত্র্য জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা পুলিশের কাছ থেকে সেবা পেতে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং আইনি সুরক্ষা ও মর্যাদাভিত্তিক আচরণের দাবি জানান। নাগরিক সেবায় সমান অভিগম্যতা, সম্মান ও সামাজিক সুরক্ষাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার আহ্বান জানানো হয়।

রাজনৈতিক ও সামাজিক কণ্ঠস্বর

এই পরামর্শ সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ–এর প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। তাঁরা সবাই দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। পাশাপাশি তরুণ, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী প্রতিনিধিরা সংস্কার প্রক্রিয়ায় নাগরিক অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিক করার ওপর জোর দেন।

আলোচনার সমাপনী অংশে অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সংস্কার তখনই টেকসই হবে, যখন তা নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে পারবে।” তিনি প্রবাসী ভোটাধিকার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ঝুঁকি ও সম্ভাবনা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। সভার সার্বিক আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, ময়মনসিংহের নাগরিকরা কেবল দ্রুত নির্বাচনই চান না; তারা চান এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে।