
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম দীর্ঘদিন ধরে সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষায় কাজ করে আসছে। নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত হলেও, বিগত রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে এটি একটি অকার্যকর ও নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে অনুমোদিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর খসড়াটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত পাসের জন্য উপস্থাপিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, সংসদ অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজ এবং বহুপক্ষীয় অংশীজনদের অংশগ্রহণে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, গত ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখ, ঢাকায় “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫: নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা” শীর্ষক একটি জাতীয় সংলাপ আয়োজন করে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আহ্বায়ক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) সংলাপটির সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি মানবাধিকার কমিশনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ’-এ এই মুহূর্তে অনেক ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সংশোধন প্রক্রিয়ায় না গিয়ে এটি দ্রুত পাশ হওয়া উচিত। ত্রুটিগুলো ভবিষ্যতে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংশোধন করা যাবে।” তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের মানবাধিকারের আকাঙ্ক্ষা মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর চেতনা থেকে উৎসারিত। ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থান সেই বৈষম্যবিরোধী চেতনাকেই পুনরুজ্জীবিত করেছে। তাই সংবিধানে বর্ণিত মানবাধিকারের সুরক্ষায় ফিরে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। তিনি মন্তব্য করেন, “বর্তমানে একটি জাতীয় নাগরিক ঐকমত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ঐকমত্যও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন সময় এসেছে এই ঐকমত্যকে সংসদে এবং সংসদের বাইরে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার।”
সংলাপে সম্মানিত আলোচক হিসেবে জনাব জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ তাঁর বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ও শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্র টিকবে না। মানবাধিকার কমিশন আন্তর্জাতিকভাবেও দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরে। অথচ আমরা এই ক্ষেত্রে এখনো ‘বি-স্ট্যাটাস’ নিয়ে বসে আছি, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকা নির্দেশ করে।” তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের ‘৩১ দফা’ অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, নাগরিক সমাজ খুব গুরুত্বের সাথে এই ইশতেহারগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে। তিনি আরও বলেন, “অতীতের অনেক বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিলেও, বর্তমান মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি আমরা দ্রুত পাশ দেখতে চাই।”
সম্মানিত আলোচক জনাব শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র ও সুশাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। অতীত অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি যে কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিলে তিলে ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা সেই অতীতে আর ফিরে যেতে চাই না।” তিনি উল্লেখ করেন যে, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমান অধ্যাদেশটি পূর্ববর্তী আইনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি বর্তমান কমিশনের ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “কমিশনের সদস্যরা নাগরিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য, তাই তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ও সংবিধানের অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় এই অধ্যাদেশটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সম্মানিত আলোচক নিজেরা করি-এর সমন্বয়কারী মিজ খুশী কবির বলেন, “রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুনিশ্চিত জীবনযাপনের জন্য মানবাধিকার রক্ষা অপরিহার্য। সংবিধানে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ৫৫ বছরেও আমরা ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ দিতে পারিনি। তাই মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” তিনি অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, এর আগে কমিশন অনেকটা ‘পেপার টাইগার’-এর মতো ছিল, যার কার্যকর কোনো শক্তি ছিল না। বিশেষ করে সরকারি কোনো ব্যক্তি মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত হলে কমিশনের কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। তিনি প্রত্যাশা করেন যে, কমিশন যেন নিজ উদ্যোগে তদন্ত করার ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পায় এবং এর কার্যক্রম যেন সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়।
সম্মানিত আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট অনারারি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তিনি মানবাধিকারের সংজ্ঞা এবং কমিশনের কার্যপরিধি স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “অধ্যাদেশটি দ্রুত অনুমোদন করা প্রয়োজন এবং ৩০ দিনের মধ্যেই অত্যন্ত জরুরি কিছু সংশোধন আনা সম্ভব। বিশেষ করে মানবাধিকারের সংজ্ঞায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ‘কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’ পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, তা নাহলে শুরুতেই কমিশনের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গুম এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তে কমিশনের ভূমিকা সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার। কমিশন কোন ধরনের অভিযোগগুলো গ্রহণ করবে এবং আদালতের সাথে তাদের কাজের সমন্বয় কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি বলেও তিনি মতামত দেন। তিনি সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা এই অধ্যাদেশটি অনুমোদন করুন, তবে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরিমার্জনগুলো এখনই সম্পন্ন করা উচিত যাতে এটি একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।”
শ্রমিক ও নারী অধিকারকর্মী মিজ তাসলিমা আখতার সম্মানিত আলোচক হিসেবে তাঁর বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “বিগত ১৫ বছরে মানবাধিকার কমিশন সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। কমিশন কেবল অভিযোগ গ্রহণ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল, কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। মানবাধিকার কমিশনের পাশাপাশি শ্রম অধিকার অধ্যাদেশও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই না এই কমিশনগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকুক। তাই সংসদ সদস্যদের কাছে আমার প্রত্যাশা মানবাধিকার কমিশনের সংজ্ঞাকে স্পষ্ট করে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এই অধ্যাদেশটি দ্রুত পাশ করুন।”
সম্মানিত আলোচক জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর তাঁর বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “সকল সংস্কারের মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ, প্রতিটি সাংবিধানিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।” তিনি মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তদন্ত ও শুনানির সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করার দাবি জানান। তিনি আরও বলেন, “আমরা কেবল নাম বা পোশাকের পরিবর্তন চাই না, বরং পুলিশ ও র্যাবের মাধ্যমে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন নির্মূল করতে চাই।” এছাড়া তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ হয় এবং সকল ধর্মের নাগরিক সমান মর্যাদা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারে।
সম্মানিত আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না, সভাপতি, নাগরিক ঐক্য। তিনি মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫-কে বর্তমান অবস্থায় হুবহু পাশের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “কমিশনকে কেবল নখদন্তহীন অবস্থা থেকে বের করলেই হবে না, একে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হবে।” তিনি কমিশনের বাছাই কমিটি, তহবিলের উৎস এবং প্রশাসনের ওপর কমিশনের আদেশের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি জানান। তিনি আরো বলেন, “কমিশনকে এমন কোনো আইনি লাইসেন্স দেওয়া উচিত নয় যা ভবিষ্যতে নাগরিক সমাজের কথা বলার জায়গা সংকুচিত করে। তাই প্রতিটি ধারা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় সংশোধন এনেই এই অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত করা উচিত।”
সম্মানিত আলোচক গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী মানবাধিকার কমিশনের অতীত অকার্যকারিতা তুলে ধরে বলেন, “বিগত বছরগুলোতে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হচ্ছে সরকার না চাইলে কমিশনগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া কোনো কমিশনের পক্ষেই সফল হওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, “কেবল মানবাধিকার কমিশন নয়, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।” তিনি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রতি এই কমিশনকে একটি শক্তিশালী ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, এমপি। তিনি মানবাধিকার রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। আমরা একটি স্বাভাবিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কোনো অস্থিরতা বা অনাচার থাকবে না।” মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদিও নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পাশ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এটি বিবেচনা করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “অধ্যাদেশটি হুবহু পাশ হবে কি না তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, এটি সংসদীয় কমিটিতে যাবে এবং সেখানে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আসার সুযোগ রয়েছে।” তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, গত ১৮ বছরের জীর্ণ দশা থেকে বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়ে একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
সম্মানিত অতিথি মাননীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, এমপি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করাকে অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের নাগরিক অধিকার চরম হুমকির মুখে। রাষ্ট্র যদি সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষা দিতে না পারে, তবে সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।” মানবাধিকারের সংজ্ঞাকে সংকুচিত না করে উন্মুক্ত রাখার ওপর জোর দেন তিনি যাতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো মানবাধিকার পরিপন্থী আইনের বেড়াজালে কেউ আটকে না পড়ে। তিনি বর্তমান অধ্যাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ ‘বাছাই কমিটি’র কাঠামোটি বজায় রাখার পক্ষে মত দেন। এছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের অতিভক্তি বা অতি নিন্দার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানকে ‘ঈশ্বর’ বা ‘শয়তান’ না বানিয়ে দোষে-গুণে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করলেই শাসনব্যবস্থায় পেশাদারিত্ব ও ভারসাম্য ফিরে আসবে।”
মাননীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির, এমপি সম্মানিত অতিথি হিসেবে সংলাপে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি প্রতিফলন এবং সংজ্ঞার সরলীকরণের প্রস্তাব দেন। অভিযোগ দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ কার্যকর করার পদ্ধতি স্পষ্ট করার ওপরও জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, “সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার করা হলে সংসদ সদস্যরা এখন অনেক বেশি স্বাধীন হবেন এবং সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার মাধ্যমে এই আইনটিকে আরও শক্তিশালী ও প্রয়োগযোগ্য করে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।”
সম্মানিত অতিথি মাননীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ. এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন, এমপি মানবাধিকার রক্ষায় কেবল আইনের ওপর নির্ভর না করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “অনেক আইন থাকলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো পরাধীন মানসিকতা। যারা প্রতিষ্ঠান চালাবেন, তাদের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস থাকতে হবে।” রাজনীতিবিদের সততাকে মানবাধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “রাজনীতি যদি ত্যাগের বদলে অবৈধ সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হয়, তবে কোনো কমিশনই নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে পারবে না।” তিনি তাঁর বক্তব্যে অভিযোগ দাখিলের সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করা এবং মানবাধিকারের সংজ্ঞাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার দাবি জানান।
মাননীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোঃ ফজলুর রহমান, এমপি সম্মানিত অতিথি হিসেবে তাঁর বক্তব্য রাখেন। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি মানবাধিকারকে কেবল আইনি কাঠামোর ভেতর না দেখে এর ঐতিহাসিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, “৫৪ বছর আগে যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, সেখানে আজ মানবাধিকারের জন্য অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে, এটি আমাদের জন্য বেদনার।” তিনি গত দেড় দশকের অপশাসন ও গণতান্ত্রিক সংকটের উদাহরণ টেনে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ বাস্তবায়িত না হলে মানবাধিকার কেবল দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাঁর মতে, “মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রের শেকড় থেকে সংস্কার শুরু করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা ও অপরাজনীতি জিইয়ে রেখে মানবাধিকার রক্ষা করা অসম্ভব।” তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমার বিশ্বাস রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে একটি ‘মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে সংসদ সদস্যরা কেবল দলের নয়, বরং জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা রাখবেন।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহান সংলাপে বিশেষ মন্তব্য প্রদান করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক পরিচয়ে বিরোধী দলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে সংস্কৃতি আমরা দেখেছি, তা থেকে বেরিয়ে আসা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।” তিনি মন্ত্রীর নিজের কারাবরণ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন রাখেন, “আপনি নিজেই একসময় সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন, সেই জায়গা থেকে এখন ক্ষমতায় এসে অন্যদের অধিকার রক্ষায় আপনি কী ভূমিকা নেবেন?”
সংলাপে সমাপনী বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমদ, এমপি। তিনি মানবাধিকার রক্ষায় বর্তমান সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা নিজেরা অতীতে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছি, তাই রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হোক তা আমরা কখনোই চাই না।” তিনি জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশকে ৩০ দিনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে এই অধিবেশনে পাশ করা সম্ভব হবে না, তবে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।
প্রফেসর রেহমান সোবহানের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “মানবাধিকারের মানদণ্ডকে আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে চাই, তবে আমাদের সামাজিক বাস্তবতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে। হঠাৎ করে এই মানদণ্ড শতভাগ অর্জন সম্ভব হবে না, তবে আমরা একটা ‘ব্রিদিং স্পেস’ বা উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে চাই।” পাহাড়ি অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং জাতীয় অখণ্ডতা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে শতভাগ মানবাধিকারের সংজ্ঞাকে পশ্চিমা আদলে প্রয়োগ করা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে যোদ্ধাদের ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তির যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যুদ্ধের ময়দানে বা গণঅভ্যুত্থানে যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রথাগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের দাঁড়িপাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।” তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং জাতীয় সংসদে সুস্থ বিতর্কের মাধ্যমেই একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বক্তব্যের শেষে তিনি ন্যাশনাল রিকন্সিলিয়েশন কমিশনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “বিগত সময়ের মতো প্রতিহিংসার রাজনীতি বহাল রেখে শান্তি আসবে না। ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একটি কমিশন গঠন করা হবে, যা জাতির ক্ষত উপশম করবে। দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ কমিশনের আদলে আমরা যদি আংশিক সত্যও প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয় তবেই একটি ঐক্যবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।”
সংলাপের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বেশ কিছু মৌলিক দাবি তুলে ধরেন। আলোচনায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় মানবাধিকার কমিশনের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব ও সক্রিয় ভূমিকার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এছাড়া, সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখা এবং ডিজিটাল আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধের দাবি জানানো হয়। বক্তারা মানবাধিকার কমিশনকে দাপ্তরিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নাগরিক সমাজের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয় বৃদ্ধির পরামর্শ দেন।
Leave A Comment