এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ উদ্যোগের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হলো একটি আঞ্চলিক পরামর্শ সভা। প্রাক-নির্বাচনী এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক নাগরিক ইশতেহার প্রণয়নের জন্য স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকার জানা। সভায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আলোচনার সূচনায় জাতীয় সংগীত ও প্রাসঙ্গিক তথ্যচিত্র প্রদর্শনের পর ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অতীতের কর্তৃত্ববাদী অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। কেবল সরকার পরিবর্তন নয়—কাঠামোগত সংস্কার, নাগরিক নজরদারি ও জবাবদিহিতাই গণতান্ত্রিক উত্তরণকে টেকসই করতে পারে।

মেন্টিমিটার ফলাফল: চট্টগ্রামবাসীর শীর্ষ ৫টি দাবি

ডিজিটাল ভোটিং প্ল্যাটফর্ম মেন্টিমিটার ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেন। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে আসে—

  1. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা

  2. শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও মানসম্মত শিক্ষা

  3. সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা

  4. কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়ন
  5. স্বাধীন বিচার বিভাগ ও ন্যায়বিচার

জাতীয় ইস্যু: বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার

চট্টগ্রামের আলোচনায় জাতীয় পর্যায়ের সংস্কার ইস্যুগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। বিচারপ্রাপ্তির পথ সহজ করতে বিভাগীয় পর্যায়ে স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন, মামলা নিষ্পত্তিতে সময় কমানো এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা বাড়ানোর দাবি উঠে আসে। একইসঙ্গে শিক্ষা খাতে গুণগত মান নিশ্চিত করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেবার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যখাতে আলোচনায় গ্রাম–শহর বৈষম্য কমানো, টেলিমেডিসিন সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যবীমা বা হেলথ কার্ডের মতো সর্বজনীন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রসঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা স্বচ্ছ প্রশাসন, দুর্নীতিবিরোধী কার্যকর পদক্ষেপ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং শ্রমবাজারে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

আঞ্চলিক সংকট: বন্দর, লজিস্টিক্স ও নগর বাস্তবতা

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাস্তবতায় বন্দর ও লজিস্টিক্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। অংশগ্রহণকারীরা চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। পাশাপাশি নগর জীবনের বাস্তব সংকট—কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন, নারী ও প্রতিবন্ধী-বান্ধব অবকাঠামোর ঘাটতি এবং নাগরিক সেবা পেতে হয়রানি—এসব বিষয় নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও আঞ্চলিক আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

রাজনৈতিক ও স্থানীয় কণ্ঠস্বর

সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় অংশীজনদের কণ্ঠস্বর আলোচনাকে আরও বহুমাত্রিক করে তোলে। চট্টগ্রাম পরামর্শ সভায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ–এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। তাঁরা একমত পোষণ করেন যে, নির্বাচন ও সংস্কারকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা জনপ্রতিনিধিদের নিয়মিত জনসম্মুখে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং উন্নয়ন সিদ্ধান্তে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। আলোচনায় একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারও স্পষ্টভাবে উঠে আসে।