
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ-এর “বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ” উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হলো আঞ্চলিক পরামর্শ সভা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক ‘নাগরিক ইশতেহার’ তৈরির লক্ষ্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম স্থানীয় পর্যায়ের অংশীজনদের মতামত জানতে ইতিমধ্যেই সিলেটে ২৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ আঞ্চলিক পরামর্শ সভা আয়োজন করে। এই ধারাবাহিক আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বে রাজশাহী জেলায় ১৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় । ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আহ্বায়ক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি উক্ত আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত এবং তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে আয়োজনের প্রেক্ষাপট উপস্থিত সুধীর কাছে তুলে ধরা হয়ে। “সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন—এই তিনটি ইস্যুকেই কেন্দ্র করে বর্তমানে জাতীয় জীবন আবর্তিত হচ্ছে।” উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “আমরা চাই এমন এক নতুন পরিস্থিতি যেখানে নেতারা বলবেন আর জনতা শুনবে—এই ধারা উল্টে যাবে। জনগণের কণ্ঠস্বরই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।”
আলোচনার শুরুতেই জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা জানতে ডিজিটাল ভোটিং প্ল্যাটফর্ম ‘মেন্টিমিটার’-এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের কাছে তাদের প্রত্যাশা জানতে চাওয়া হয়। নিজ নিজ ডিভাইস থেকে উপস্থিত সকলে তাদের প্রত্যাশার ব্যক্ত করেন যা বড় স্ক্রীণে সরাসরি দেখানো হয়।
প্রত্যাশায় বড় হয়ে ফুটে উঠেছে✅ নিরাপত্তা ✅ সুশাসন ও জবাবদিহিতা ✅ দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ ✅ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ✅ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সৃজনশীল শিক্ষা

আলোচনা থেকে কি কি এলো?
১. জাতীয় ইস্যু: সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো
আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল জাতীয় পর্যায়ের সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো। অংশগ্রহণকারীরা একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পুলিশের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।
আলোচনায় যুব প্রতিনিধিরা ছাত্র–জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা থেকে উদ্ভূত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, এই সনদের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
নির্বাচনী সংস্কারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। অংশগ্রহণকারীরা এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবি জানান, যেখানে ভোট চুরির সুযোগ থাকবে না এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে সত্যিকার অর্থে দায়বদ্ধ থাকবেন। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয় কমিয়ে সৎ, যোগ্য ও সাধারণ প্রার্থীদের জন্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাইবার নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিজিটাল পরিসরে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
মুখস্থ নির্ভর নয়, বরং কর্মমুখী ও সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত জাতীয়করণের প্রস্তাব আসে। সরকারি হাসপাতালে সিন্ডিকেট নির্মূল এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে অতিরিক্ত টেস্ট ও ডাক্তারদের ভিজিট কমানোর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার দাবি জানানো হয় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে।

২. আঞ্চলিক সংকট: তিস্তা ও পানির অধিকার
রাজশাহীর জনজীবনে পানির গুরুত্ব এবং তিস্তা সংকট নিয়ে সভায় উত্তপ্ত আলোচনা হয়। স্থানীয় প্রতিনিধিরা বলেন:
-
তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা: তিস্তা নদীর পানি সংকটকে উত্তরবঙ্গের ‘মরুকরণ’ প্রক্রিয়ার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেন, তিস্তা ও ফারাক্কা ইস্যুতে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরদার করতে হবে এবং প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণ বিকল্প জলাধার নির্মাণে আন্তর্জাতিক কারিগরি সহায়তা নিতে হবে।
-
সারফেস ওয়াটার ও সংরক্ষণ: শুধু গ্রাউন্ড ওয়াটারের ওপর নির্ভর না করে পদ্মা ও তিস্তার পানি সংরক্ষণের জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানানো হয়। কৃষকরা দাবি করেন, “পদ্মা নদীতে সারা বছর পানি থাকলে উত্তরবঙ্গের সোনালী দিন ফিরে আসবে।”
-
কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন: রাজশাহী যেহেতু আম ও সিল্কের জন্য বিখ্যাত, তাই এখানে আম সংরক্ষণাগার (Cold Storage), ফ্রুট প্রসেসিং জোন এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া জুট মিল ও সুগার মিলগুলো চালুর মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
-
যোগাযোগ ও জ্বালানি: সরাসরি রেল ও বিমান যোগাযোগের উন্নয়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে শিল্পায়নের পরিবেশ তৈরির দাবি জানান ব্যবসায়ী ও নাগরিক প্রতিনিধিরা।
জাতীয় ও রাজনৈতিক সংস্কার: রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণ
সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিরা তাঁদের সংস্কারসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, প্রকৃত সংস্কারের জন্য প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনীতিমুক্ত করতে হবে, যাতে সরকারি কর্মকর্তারা ভয়ভীতি ছাড়া দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একই সঙ্গে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি সীমিত ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর প্রভাব বিদ্যমান, যা ভেঙে সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। আলোচনায় নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিও উঠে আসে। বক্তারা বিশেষভাবে নির্বাচনে অতিরিক্ত অর্থের প্রভাব কমানো এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
রাজশাহীর এই পরামর্শ সভায় সম্মিলিতভাবে একটি বার্তা উঠে এসেছে—“প্রশাসন ও রাজনীতি হতে হবে জনগণের জন্য।” অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে থাকা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দূর করতে হবে। রাজশাহীর বিশেষ ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং পানি সমস্যার সমাধান না করলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এই মতামতগুলোকে একত্রিত করে একটি ‘নাগরিক ইশতেহার’ তৈরি করবে, যা আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পেশ করা হবে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সভার সমাপ্তি টেনে বলেন, “জনগণের এই সাহসী মতামতই আমাদের আগামীর পথপ্রদর্শক। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর সমান গুরুত্ব পাবে।”
Leave A Comment