
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ-এর “বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ” উদ্যোগের অংশ হিসেবে বরিশালে অনুষ্ঠিত হলো আঞ্চলিক পরামর্শ সভা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক ‘নাগরিক ইশতেহার’ তৈরির লক্ষ্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম স্থানীয় পর্যায়ের অংশীজনদের মতামত জানতে ধারাবাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ বরিশাল জেলায় এই পরামর্শ সভা আয়োজন করে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আহ্বায়ক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি উক্ত আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন।
অনুষ্ঠানের শুরু হয় জাতীয় সংগীত দিয়ে। এরপর তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে আয়োজনের প্রেক্ষাপট উপস্থিত সুধীর কাছে তুলে ধরা হয়। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্যে বরিশালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, “বিগত সময়ে দেশে একটি ‘চামচা পুঁজিবাদ’ বা ‘চোরতন্ত্র’ (Kleptocracy) গড়ে উঠেছিল, যেখানে আমলা, রাজনীতি ও ব্যবসায়ীর ত্রিমূর্তি রাষ্ট্রকে লুণ্ঠন করেছে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে কাউকে পেছনে রাখা হবে না, কারণ কাউকে পেছনে রেখে রাষ্ট্র নিজেও এগোতে পারে না।”
আলোচনার শুরুতে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা জানতে ডিজিটাল ভোটিং প্ল্যাটফর্ম ‘মেন্টিমিটার’-এর মাধ্যমে মতামত সংগ্রহ করা হয়। উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাঁদের অগ্রাধিকারগুলো চিহ্নিত করেন।
প্রত্যাশায় বড় হয়ে ফুটে উঠেছে ✅ যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান ✅ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সাম্য ✅ সুশাসন ও জবাবদিহিতা ✅ বাক-স্বাধীনতা ✅ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা

আলোচনা থেকে কী কী এলো?
১. জাতীয় ইস্যু: সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো
বরিশালের আলোচনায় জাতীয় পর্যায়ের সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘লুটপাট তন্ত্র’ ভাঙার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা, অটোপাস সংস্কৃতির বিলোপ এবং পেশাজীবীদের বিশেষ করে চিকিৎসকদের সান্ধ্যকালীন প্র্যাকটিস ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটি আইনী কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে উঠে আসে। নাগরিকরা দাবি করেন, রাষ্ট্রের সম্পদ যেন গুটি কয়েক অলিগার্ক বা গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত না হয়, তার জন্য শক্তিশালী নীতিমালা প্রয়োজন।
শিক্ষা ও মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের (মিড-ডে মিল) ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়াও, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে এনে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে আসে। দুর্নীতিবাজদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করার দাবিও জানান অংশগ্রহণকারীরা।

২. আঞ্চলিক সংকট: জ্বালানি ও উপকূলীয় সুরক্ষা
বরিশাল যেহেতু দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ ও নদীমাতৃক অঞ্চল, তাই স্থানীয় সংকটগুলো আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্থানীয় প্রতিনিধিরা বলেন:
-
জ্বালানি ও শিল্পায়ন: ভোলার গ্যাস বরিশালে পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুত নিয়ে আসার দাবি জানানো হয়। ন্যাশনাল গ্রিডে গ্যাস না থাকায় এই অঞ্চলে শিল্প বিনিয়োগ থমকে আছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়।
-
মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্প: ইলিশ ও কৃষি পণ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রসেসিং জোন এবং হিমাগার স্থাপনের দাবি জানানো হয়। বিশেষ করে পিরোজপুরের পেয়ারা ও নদীমাতৃক এলাকার মাছ সংরক্ষণের সুব্যবস্থা করার প্রস্তাব আসে।
-
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন: উপকূলীয় এলাকায় নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ এবং জলোচ্ছ্বাসের সময় গবাদিপশুসহ আশ্রয়ের জন্য উপযোগী বহুতল সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের দাবি ওঠে। ভাসমান মানতা সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার ও এনআইডি সমস্যা সমাধানের তাগিদ দেওয়া হয়।
-
যোগাযোগ ও পর্যটন: কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে নৌ-পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ এবং বরিশাল নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানানো হয়।
জাতীয় ও রাজনৈতিক সংস্কার: রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণ
সভায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাসদ, গণঅধিকার পরিষদ এবং এনসিপি-র স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে তাঁদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাঁরা ঐক্যমত্য পোষণ করেন যে, একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রতিশ্রুতি দেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে জনপ্রতিনিধিদের স্থানীয় উন্নয়ন কাজের খবরদারির পরিবর্তে আইন প্রণয়নে ব্যস্ত রাখবেন এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করবেন। মেহনতি মানুষের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্রের সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে একটি মানবিক সাম্য ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেন তাঁরা। এছাড়াও, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশের বিষয়েও ইতিবাচক মত প্রকাশ করেন।
বরিশালের এই পরামর্শ সভায় সম্মিলিতভাবে একটি বার্তা উঠে এসেছে—“প্রশাসন ও রাজনীতি হতে হবে জনগণের জন্য।” অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, বরিশালকে কেবল ‘দরিদ্রতম বিভাগ’ হিসেবে না দেখে এর বিশেষ ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সুষম বাজেট বণ্টন প্রয়োজন। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এই মতামতগুলোকে একত্রিত করে একটি ‘নাগরিক ইশতেহার’ তৈরি করবে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সভার সমাপ্তি টেনে বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি পরিবর্তনের সুযোগ আসে, কিন্তু সেটা ধরে রাখা কঠিন। ২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন আমাদের যে শক্তি দিয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হবে। আপনাদের এই সাহসী কণ্ঠস্বরই আমাদের আগামী দিনের পাথেয়।”
Leave A Comment