এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের উদ্যোগে রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত হলো আঞ্চলিক পরামর্শ সভা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক নাগরিক সংলাপের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সভার লক্ষ্য ছিল—আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা, উদ্বেগ ও অগ্রাধিকারগুলো শোনা এবং সেগুলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক ইশতেহার-এ প্রতিফলিত করা। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজনকে ঘিরে রাঙামাটি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ বাস্তবতা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

সভায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ একটি গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—পরিবর্তনের সুযোগ এলেও তা টেকসই করা কঠিন। তাঁর মতে, সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন যতটা সহজ, বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন; আর সাধারণ মানুষের স্বার্থকে কেন্দ্র করে সেই সংস্কার ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে সব নাগরিকের কণ্ঠ সমানভাবে শোনা না গেলে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

নাগরিক প্রত্যাশা: ডিজিটাল ভোটিংয়ে উঠে এলো রাঙামাটির অগ্রাধিকার

সভায় অংশগ্রহণকারীদের মতামত জানতে মেন্টিমিটার-এর মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ভোটিং আয়োজন করা হয়। ভোটিংয়ে অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া মতামতে রাঙামাটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়—

  • পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন (এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্নমত)

  • জানমালের নিরাপত্তা ও সহিংসতা বন্ধ

  • ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ও ভূমি কমিশন কার্যকর করা

  • দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ প্রশাসন

  • সুশাসন, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন

ভোটিংয়ের ফলাফলে একদিকে যেমন শান্তি চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি উঠে আসে, অন্যদিকে চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের দাবিও দৃশ্যমান হয়। তবে এই ভিন্ন মতের মাঝেও অস্ত্রমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পার্বত্য চট্টগ্রাম—এই আকাঙ্ক্ষায় একটি স্পষ্ট ঐক্য প্রতিফলিত হয়।

জাতীয় ইস্যু: সংস্কার, নির্বাচন ও জবাবদিহিতা

আলোচনায় জাতীয় পর্যায়ের সংস্কার ইস্যুতে অংশগ্রহণকারীরা জোর দেন যে, নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়—এটি গণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি। কিন্তু নির্বাচন অর্থবহ করতে হলে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার নিয়েও আলোচনা হয়; বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি উন্নয়ন ও ন্যায্যতা—দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া কোনো সংস্কারই জনগণের আস্থা অর্জন করবে না।

আঞ্চলিক বাস্তবতা: পার্বত্য চট্টগ্রাম, ভূমি ও নিরাপত্তা

রাঙামাটির আলোচনায় আঞ্চলিক সংকটগুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক সমস্যা, যা শান্তি চুক্তির সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভূমি কমিশন কার্যকর না হওয়ায় স্থায়ী বাসিন্দাদের অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বারবার সহিংস ঘটনার বিচার না হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

কাপ্তাই বাঁধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্ষতিপূরণ, বাঁধের মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থা, দুর্গম এলাকায় শিক্ষা ও যোগাযোগের সংকট, নারী নিরাপত্তা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং পর্যটন উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ—এসব বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। অনেক বক্তা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও সম্মতি নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন আরও বৈষম্য তৈরি করবে।

রাজনৈতিক ও স্থানীয় কণ্ঠস্বর

সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ–এর প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট, শান্তি চুক্তি, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে মতামত দেন।

রাজনৈতিক বক্তারা একমত হন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন—যেখানে ভূমি সমস্যা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, নিরাপত্তা এবং সকল সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।

শান্তি, অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহিতার পথে

রাঙামাটির এই আঞ্চলিক পরামর্শ সভা থেকে একটি শক্ত বার্তা উঠে এসেছে—পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একমাত্র নিরাপত্তা বা উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি ও মর্যাদার প্রশ্ন। ভিন্ন মত থাকা সত্ত্বেও অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, অস্ত্রমুক্ত পরিবেশ এবং কার্যকর জবাবদিহিতাই এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত মতামত একত্রিত করে একটি নাগরিক ইশতেহার প্রণয়ন করবে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হবে—যাতে আগামী দিনের রাষ্ট্র সংস্কারে পার্বত্য চট্টগ্রামের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত না থাকে।