এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের উদ্যোগে রংপুরে অনুষ্ঠিত হলো আঞ্চলিক পরামর্শ সভা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক নাগরিক সংলাপের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সভার লক্ষ্য ছিল—আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, উদ্বেগ ও অগ্রাধিকারগুলো শোনা এবং সেগুলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক ইশতেহার-এ প্রতিফলিত করা।

সভায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। এই সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো না গেলে ভবিষ্যতে আর আফসোস করার সুযোগ থাকবে না। তাঁর মতে, রাষ্ট্র ও রাজনীতি বদলালেও নাগরিকদের স্বার্থ রয়ে যায়—এ কারণেই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণে জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা একটি নৈতিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।

নাগরিক প্রত্যাশা: মেন্টিমিটারে রংপুরের মানুষের অগ্রাধিকার

মেন্টিমিটার–এর মাধ্যমে নেওয়া ডিজিটাল ভোটিংয়ে রংপুর অঞ্চলের নাগরিকদের অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্টভাবে উঠে আসে। ভোটিংয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব পায় বিদেশ যাত্রায় সহযোগিতা, যা কর্মসংস্থান ও নিরাপদ অভিবাসনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহিতা এবং নারীর নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলো নাগরিকদের কাছে রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক শর্ত হিসেবে প্রতিফলিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা আরও জোর দিয়ে বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতিফলন হিসেবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া জনগণের আস্থা অর্জন করবে না।

জাতীয় ইস্যু: নির্বাচন, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক সংস্কার

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নির্বাচন তখনই অর্থবহ হবে যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের কাছে নিয়মিতভাবে জবাবদিহি করবেন। প্রস্তাব আসে—নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য বার্ষিক পাবলিক হিয়ারিং বাধ্যতামূলক করা, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি প্রকাশ করা এবং তা নির্বাচনী বিধিমালার অংশ করা।

একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ মনে করেন, সৎ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনই সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত। তবে কেউ কেউ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেন। এই বিতর্ক থেকেই উঠে আসে—নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা—দুটোকেই একসাথে শক্তিশালী করা জরুরি।

আঞ্চলিক বাস্তবতা: নাগরিক সেবা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা

রংপুর অঞ্চলের বাস্তব সংকটগুলো আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিদ্যুৎ, পানি, ভূমি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিয়ে নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রিপেইড মিটার, ভূমি সেবা পেতে হয়রানি, থানায় মামলা গ্রহণে অনীহা—এসব বিষয় তুলে ধরে বক্তারা বলেন, নাগরিক সেবাকে দৃশ্যমানভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মতামত উঠে আসে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্তি, ভোটকেন্দ্রকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা, বয়স্ক ও অসহায় মানুষের ভাতা ব্যবস্থাকে করুণাভিত্তিক না রেখে কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন অংশগ্রহণকারীরা। হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা চাকরিতে ঘুষ, সামাজিক বৈষম্য ও প্রজন্মান্তরের দারিদ্র্যের কথা তুলে ধরে সামাজিক উত্তরণ (social mobility) নিশ্চিত করার দাবি জানান।

রাজনৈতিক ও নাগরিক কণ্ঠস্বর

রংপুরের এই আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রতিনিধিদের সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনাকে আরও বহুমাত্রিক করে তোলে। সভায় একজন হিজড়া কমিউনিটির প্রতিনিধি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রংপুর–৩ আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেন, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার পর্যায়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ নিয়েও একাধিক রাজনৈতিক নেতা তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন।

এছাড়াও সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে নির্বাচন, সংস্কার, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিষয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা জোরদার করা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং প্রান্তিক ও লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভা সমাপ্তির আগে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাষ্ট্র সংস্কারের এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পরিবর্তনের সুযোগ এলেও তা ধরে রাখা কঠিন। তিনি বলেন, সংস্কারকে কেবল আলোচনার পর্যায়ে রেখে দিলে হবে না; তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সর্বোপরি নাগরিকদের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ ও নজরদারি। তাঁর মতে, নির্বাচন সামনে রেখে নাগরিকদের যে দাবিগুলো উঠে আসছে—জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা—এসবকে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই সাহসী ও স্পষ্ট কণ্ঠস্বরই নাগরিক ইশতেহারকে শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।