Download Keynote Presentation

১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রথম বাজেটকে সামনে রেখে ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯’ কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। আগামী বাজেটকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা তুলে ধরে, যেখানে বাজেটের অগ্রাধিকার, জবাবদিহিমুলক সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং কার্যকর অর্থনৈতিক পথরেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখ আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য  মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক জনাব তৌফিকুল ইসলাম খান। মিজ তারান্নুম জিনান, সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েট, সিপিডি ও নেটওয়ার্ক ফোকাল পয়েন্ট, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ব্রিফিংয়ে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

আলোচনার শুরুতেই ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটও অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। একই সাথে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও নাগরিক প্রত্যাশাও অনেক বেশি। আগামী বাজেটের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি সরকারের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত দায়-দেনা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, যা দারিদ্র্য ও বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে। এর পাশাপাশি তিনি ‘পরাবাস্তব’ ও অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়নের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে তথ্যভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরির কথা বলেন।

বাজেটে আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ড. দেবপ্রিয় তাঁর বক্তব্যে দ্বিমুখী কৌশলের ওপর জোর দেন। প্রথমত, রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় কমানো, সম্পদ কর চালু এবং লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের শেয়ার বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের পরামর্শ দেন। এছাড়া পাচার হওয়া সম্পদ ও খেলাপি ঋণ উদ্ধারে দেশি-বিদেশি আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের কথাও বলেন তিনি। দ্বিতীয়ত, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা ধাপে ধাপে কমানোর সুপারিশ করেন। সরকারি মজুরি-পেনশন সংস্কার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমিয়ে ‘বেইলআউট’ সংস্কৃতি থেকে সরে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় টেকসই অর্থায়ন কৌশল চিহ্নিত করার কথাও বলেন তিনি।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, নতুন সরকার প্রচলিত বাজেটের সংস্কৃতি কতটা বদলাতে পারছে তা যাচাইয়ে কিছু ‘লিটমাস টেস্ট’ থাকবে। এর মধ্যে প্রধান দু’টি হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর অকার্যকর বা দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ ‘জম্বি প্রকল্প’ বাদ দেওয়া। এ প্রেক্ষিতে তিনি একটি স্বল্পমেয়াদি এডিপি রিভিউ টাস্কফোর্স গঠন এবং এনবিআর-এর প্রশাসনিক সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। নতুন সরকারের জন্য একটি অর্থনৈতিক পথরেখা তুলে ধরে তিনি ২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটকে পেশাদার পর্যালোচনার আওতায় আনা এবং বাকি সময়ের জন্য কঠোর বাজেট শৃঙ্খলা (হার্ড বাজেট কন্সট্রেইন্ট) আরোপের আহ্বান জানান। পাশাপাশি, ২০২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন এবং আগামী তিন বছরের জন্য একটি মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামো তৈরির কথা বলেন। একই সাথে তথ্য ও সমন্বয় ঘাটতি দূর করতে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর নেতৃত্বে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, বৈশ্বিক সংকট ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং বাজেট মনিটরিং ও রিসোর্স কমিটিকে সক্রিয় করার আহ্বান জানান।

ড. দেবপ্রিয় সরকারকে জাতীয় সংসদে প্রতি তিন মাসে (ত্রৈমাসিক) আর্থিক প্রতিবেদন পেশ করার সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং শক্তিশালী ‘পলিসি স্টেটমেন্ট’ হিসেবে নিয়ে আসতে হবে, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং সংসদের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতা জোরদার করবে। একই সাথে নির্বাচনী ইস্তেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নাগরিক ও গণমাধ্যমের নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলেও মতামত দেন তিনি।

এই ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং উপস্থাপনার শেষে তারা বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক জনাব তৌফিকুল ইসলাম বলেন, “আইনগতভাবে মার্চ মাসের মধ্যে সরকারের সংশোধিত বাজেট পেশ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখন পর্যন্ত আমরা তা দেখিনি।” তিনি আরও বলেন অর্থনীতি বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, সেই প্রেক্ষিতে কর আদায়সহ আয়-ব্যয়ের অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারকে কারিগরি ও কৌশলগতভাবে আরো শক্ত অবস্থানে যেতে হবে।

উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ চলমান জ্বালানি সংকট, অর্থনীতির কাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যা, দায়-দেনা পরিস্থিতি, ইত্যাদি বিষয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়।