
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে ঢাকায় “নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে আগামী দিনের শিক্ষা খাত: নতুন চিন্তা, নতুন কাঠামো ও নতুন পদক্ষেপ” শীর্ষক সংলাপ আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব ববি হাজ্জাজ, এমপি, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব মাহ্দী আমিন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, এমপি এবং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
সভাপতির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শিক্ষা খাতের সংস্কার ও নীতি নির্ধারণে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সময়ের দাবি। নতুন প্রজন্মের জন্য কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং বেসরকারি খাতসহ সকল অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান গত এক দশকে প্রচলিত শিক্ষা খাতের ‘সাফল্যের বয়ান’-এর বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতির একটি সমালোচনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের পরিবর্তিত বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে পারছে না। এই অসামঞ্জস্য দূর করতে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, এমপি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আমরা যদি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে শিক্ষাকে একটি খাত হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে।” তিনি নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা ও ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শিক্ষাক্রমে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে আগামী ২–৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬টি খেলাধুলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া আগামী ৫ বছরের মধ্যে প্রতিটি স্কুলে কমপক্ষে ৩টি সহশিক্ষামূলক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালুর বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন।
বিশেষ অতিথি মাহ্দী আমিন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে তা দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে। তিনি শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে সুশীল নাগরিক গুণাবলি বিকাশ এবং দক্ষ কর্মী তৈরি—এই দুই দিককে গুরুত্ব দেন।
সম্মানিত অতিথি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, এমপি শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কেবল পাঠ্যক্রম পরিবর্তন নয়; বরং নৈতিকতা, জ্ঞান এবং দক্ষতার সমন্বয়ে একটি সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তিনি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বিশেষ বক্তা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-এর কোর গ্রুপ সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসার ঘটলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দালালচক্রের প্রভাব এখনো বিদ্যমান। শিক্ষা ক্ষেত্রেও কোচিং ও গাইডবই নির্ভরতা একটি অস্বাস্থ্যকর প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি পদ্ধতি বাতিলের সমালোচনা করেন।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপের সদস্য জনাব আসিফ ইব্রাহিম বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কত দ্রুত শিক্ষাকে উৎপাদন, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারি তার উপর। সঠিক নীতি, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র-শিল্প-শিক্ষা খাতের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক এবং আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। যেখানে শিক্ষা হবে উন্ন্যনের চালিকাশক্তি, আর মানবসম্পদ হবে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বিশ্ব ব্যাংক-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ (এডুকেশন গ্লোবাল প্র্যাকটিস) সাইদ রাশেদ আল-জায়েদ (জশ) শিক্ষার্থী মূল্যায়নে সরকারের স্বতন্ত্র উদ্যোগের অভাবের সমালোচনা করেন। তিনি কোভিড-১৯সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সামাজিক কারণে শিক্ষার্থীদের সরাসরি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং শিখনঘাটতি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আরেক আলোচক, টিচ ফর বাংলাদেশ-এর প্রধান নির্বাহী, শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতি প্রণয়নে কেন্দ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব তুলে ধরেন। তিনি পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারে শিক্ষার্থীদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন এবং বলেন, “আমরা AI Dependent প্রজন্ম নয়, AI Empowered প্রজন্ম চাই।”
ব্র্যাক আইইডি-এর প্রোগ্রাম হেড সমীর রঞ্জন নাথ উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত উন্নত হলেও শিক্ষার গুণগত মান প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি। তিনি শিক্ষা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের মানোন্নয়ন, সমন্বয় এবং সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
উন্নয়ন ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ নাদিয়া রশিদ প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণ এবং কর্মরত শিক্ষকদের জন্য অন-দ্য-জব প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এছাড়াও তিনি শিক্ষা বিষয়ক সরকারি প্রজেক্টসমূহের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করেন।
সম্মানিত আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রুবাইয়া মোরশেদ শিক্ষাক্রম, পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মৌলিক সংস্কার ছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে ট্যাব বিতরণ কার্যক্রমের সমালোচনা করেন। এছাড়াও তিনি সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষাবিদ, শিক্ষক প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকরা শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তারা মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে নীতি প্রণয়নে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পাঠ্যপুস্তকের মানোন্নয়নে গৃহীত উদ্যোগ তুলে ধরেন। এছাড়াও শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ জোরদার, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, কোচিং বাণিজ্যের প্রভাব হ্রাস, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তির বিকাশ এবং প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির মত বিষয়গুলো আলোচনা থেকে উঠে আসে।
সমাপনী বক্তব্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “শিক্ষা খাতের সংস্কার একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।” তিনি নীতি প্রণয়ন, অর্থায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেশের উন্নয়ন কৌশল, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে।
Leave A Comment