“উনারা নতুন শক্তির কথা বললেও শেষ বিচারে একটি ক্ষুদ্র ও উগ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।” গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঢাকায় ‘নাগরিক ইশতেহার ২০২৬’ উন্মোচন উপলক্ষে আয়োজিত ‘আগামী সরকারের জন্য নির্বাচিত নীতি সুপারিশ ও প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “উনারা সঠিক আচরণ করতে পারলেন না।” উনারা নাগরিকদের সুরক্ষাও দিতে পারলেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উনারা কি নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনটাও করতে পারবেন কি না।”

‘বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম একটি নাগরিক ইশতেহার প্রস্তুত করেছে। এই ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন নীতিসমূহ ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচিগুলো চলমান নির্বাচনী আলোচনায় এবং রাজনৈতিক দলসমূহের ইশতেহারে প্রতিফলিত করার উদ্দেশ্যে সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করা হয়।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “সরকার যেই সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা, অংশীজনের অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা দেখাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, সংলাপের ক্ষেত্রে সরকার কেবল রাজনীতিবিদদের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে; ফলে জাতীয় জাগরণ ও জন-অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি ‘নতুন বন্দোবস্ত’ তৈরির সুযোগ হারিয়ে গেছে। এর ফলে দুটি নেতিবাচক ফল দাঁড়িয়েছে:

  • প্রথমত: যারা নতুন ব্যবস্থার কারিগর হতে চেয়েছিলেন, তারা নিজেরাই পুরোনো ব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়েছেন এবং ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে গেছেন।

  • দ্বিতীয়ত: পুরোনো ব্যবস্থার ধারক-বাহক ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান ঘটেছে।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যবসায়ীরা পালিয়েছেন, রাজনীতিবিদরা আত্মগোপন করেছেন, কিন্তু আমলারা ফিরে এসেছেন। কারণ এই পুরোনো ব্যবস্থার প্রধান রক্ষক হলো আমলাতন্ত্র, আর বর্তমান সরকারই তাদের ফিরে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ করে দিয়েছে।”

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ‘নাগরিক ইশতেহার ২০২৬’-এর অংশ হিসেবে ১২টি সুনির্দিষ্ট নীতি সুপারিশ উপস্থাপন করেন। একটি টেকসই ও সুশাসনভিত্তিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে তিনি সংসদীয় জবাবদিহিতা এবং একটি দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তিনি বৈদেশিক ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে ‘ফিস্কাল স্পেস’ বা রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

যুব সমাজের সম্ভাবনা বিকাশে তিনি শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ ও প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। কৃষিখাতের আধুনিকায়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ওপর তিনি জোর দেন। এ ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত অংশগ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নিয়মিত ‘গণশুনানি’ এবং আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা তার সুপারিশের অন্যতম প্রধান দিক।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক জনাব তৌফিকুল ইসলাম খান ‘জাতীয় কর্মসূচি’র প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপন করেন। তিনি আগামী সরকারের জন্য ১০টি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচির প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, কৃষক এবং শহরের শ্রমজীবীসহ সকল স্তরের নাগরিক এর সুফল পায়। তিনি ‘সর্বজনীন ন্যূনতম আয়’ কর্মসূচির প্রস্তাব করেন, যেখানে অতি দারিদ্র্যপীড়িত ১১টি জেলা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের ৬৪টি জেলার ১৪৭ লক্ষ পরিবারকে মাসে ৪,৫৪০ টাকা নিশ্চিত আয়ের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝরে পড়া রোধে সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ বা দুপুরের খাবার চালু করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। যুবসমাজের জন্য ফেরতযোগ্য ১ লক্ষ টাকা মূল্যমানের সুদ ও জামানতবিহীন ‘যুব ক্রেডিট কার্ড’ এবং প্রতি বছরে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের সুবিধা সম্বলিত ‘জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড’ প্রবর্তনের প্রস্তাব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের সরাসরি প্রণোদনা দিতে ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ এবং কর্মজীবী নারীদের সহায়তায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে ৪০০টি ‘দিবাযত্ন কেন্দ্র’ স্থাপন করা প্রয়োজন। দুর্নীতি রোধ ও রাজস্ব বাড়াতে তিনি ‘সমন্বিত কর ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। এছাড়া সরকারি সেবাকে সহজ করতে একটি ‘সমন্বিত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার’ তৈরির প্রস্তাব করেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে বার্ষিক ব্যয় জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের মতো হবে, যা বিদ্যমান অনেক প্রকল্পের পরিমার্জন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমেই সম্ভব।

নীতি ও কর্মসূচী উপস্থাপনের পরে উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ নাগরিক ইশতেহার সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন। উপস্থাপকদ্বয় ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্যবৃন্দ তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং বক্তব্য রাখেন।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-এর কোর গ্রুপ সদস্যনিউ এজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান জনাব আসিফ ইব্রাহিম বলেন, রাজনৈতিক সরকার, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ীদের মধ্যকার ‘ত্রিমুখী নেক্সাস’ থেকে ভবিষ্যতে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিখাতের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোতে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা ও নতুন নেতৃত্ব তৈরির ওপর জোর দেন। জনাব ইব্রাহিমের মতে, উন্নত দেশের মতো জাতীয় নীতি প্রণয়নে প্রভাব রাখতে হলে আগে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাই সংস্কারের সূচনা নিজেদের সংগঠন থেকেই হওয়া প্রয়োজন।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্যমানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মিজ শাহীন আনাম সংখ্যালঘু সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলেন, কয়েক মাস ধরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন ও উপাসনালয়ে হামলা চললেও সরকার তা দমনে নির্বিকার। ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে গুজব ছড়িয়ে নির্যাতন করা হলেও বিচারহীনতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে আসন্ন নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

মিজ রাশেদা কে চৌধুরী, কোর গ্রুপ সদস্য, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, প্রত্যাশা ও দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা ডিজিটাল ব্যবস্থার কথা বললেও জন্ম নিবন্ধন বা এনআইডি-র মতো জায়গাগুলোতে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে ডিজিটাল সেবা হারিয়ে গেছে। এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রে কোচিং আর গাইড বইও এক ধরনের দালালি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিআইবি-র হিসাব অনুযায়ী দেশের দুর্নীতি যদি অর্ধেক কমানো যায়, তবেই জিডিপি ৪ শতাংশ বাড়বে। তিনি আমলাতন্ত্রকে ‘তেজি ঘোড়া’র সাথে তুলনা করে বলেন, আমলাতন্ত্রকে বাগে আনতে হলে সরকারকে তা চালানো জানতে হবে। সংস্কার শুধু সরকার বা আমলাতন্ত্রের নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক সমাজকেও সময়ের প্রয়োজনে বদলাতে হবে।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, কোর গ্রুপ সদস্য, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সদস্য, সিপিডি বোর্ড অব ট্রাস্টিজ বলেনজনগণ ও সরকারের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যাদের আমাদের কথা শোনার কথা, তারা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দেশ চালানোর বোধটাই হারিয়ে ফেলেছেন। এই বিচ্ছিন্নতাই আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা। রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত একটি চুক্তির ব্যাপার, যেখানে কিছু মানুষ আমাদের কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করবেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এ দেশটা আমরা কারো দানে পাইনি, বরং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছি। প্রতিটি মানুষের পরিচয়, মর্যাদা ও নির্ভয় জীবনের নিশ্চয়তা পাওয়াই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক নয়, ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে কাউকে ঠকানো বা প্রতারণা করাও বড় ধরনের দুর্নীতি। রাজনৈতিক দলগুলো যেন জনগণের অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দিয়ে তাদের ইশতেহার তৈরি করে, সেই বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক মিজ আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রসঙ্গে বলেন, সরকার বা আমলাতন্ত্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমরা প্রায়ই পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকি না। ফলে সরকার নীতি প্রণয়ন করলেও নাগরিকরা তার সুফল পাচ্ছে না। তাই আগামী সরকারের নীতিগুলো যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে যার যার জায়গা থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।