
বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নাগরিকদের প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকারগুলোকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিতে ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে খুলনায় গত ২০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি আঞ্চলিক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রাক-নির্বাচনী ধারাবাহিক সংলাপের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সভার মূল লক্ষ্য ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘নাগরিক ইশতেহার’ তৈরির জন্য তৃণমূলের মতামত সংগ্রহ করা।
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সূচিত এই সভার প্রারম্ভিক বক্তব্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “দেশ আজ ছাত্র–জনতার এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী চেতনার এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে দাবিগুলো লিখে রাখলেই পরিবর্তন আসবে না।”
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নাগরিকরা যদি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের ওপর নিয়মিত চাপ সৃষ্টি না করেন, তবে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বা সুশাসন অসম্ভব। তাঁর মতে, “নাগরিক কণ্ঠস্বরকে সক্রিয় ও সোচ্চার রাখাই গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার।”
মেন্টিমিটার ফলাফল: খুলনার নাগরিকদের শীর্ষ অগ্রাধিকার
ডিজিটাল ভোটিং টুল মেন্টিমিটার–এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা নবনির্বাচিত সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরেন। ভোটিংয়ের ফলাফলে খুলনা অঞ্চলের নাগরিকদের শীর্ষ পাঁচটি অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে আসে—
-
স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন
-
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই আয়ের উৎস
-
গণশুনানির আয়োজন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
-
মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা রক্ষা
-
নিরাপদ শহর ও জননিরাপত্তা

এই ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখায় যে, খুলনার নাগরিকদের কাছে সংস্কার মানে কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং স্বাস্থ্যসেবা, জীবিকা, নিরাপত্তা ও অধিকার—সবকিছুর সমন্বিত অগ্রগতি।
জাতীয় ইস্যু: জবাবদিহিতা, গণশুনানি ও মানবাধিকার
জাতীয় ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তারা অভিমত দেন যে, নির্বাচনের আগে এবং পরে জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘গণশুনানি’ প্রথাকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। তাঁরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, সংস্কার তখনই অর্থবহ হবে যখন একটি ভয়হীন পরিবেশ নিশ্চিত হবে। মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা না গেলে কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়।
আঞ্চলিক বাস্তবতা: উপকূল, স্বাস্থ্য ও নগর নিরাপত্তা
আঞ্চলিক বাস্তবতায় খুলনা ও উপকূলীয় অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো উঠে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়তে থাকা ঘূর্ণিঝড় ও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকাকে চরম সংকটে ফেলেছে। ফলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দুর্যোগসহনশীল স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ কমানোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি, নগর খুলনার জননিরাপত্তা নিয়ে নাগরিকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে মাদক, কিশোর গ্যাং এবং নারী নিরাপত্তার সংকট নিরসন করে একটি নিরাপদ ও আধুনিক মহানগরী গড়ে তোলাকে খুলনাবাসীর অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
রাজনৈতিক ও নাগরিক কণ্ঠস্বর
এই পরামর্শ সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন। আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণ অধিকার পরিষদ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ–এর প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনা যায়। নাগরিকরা তাঁদের কাছে স্বাস্থ্য, জীবিকা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি জানতে চান।
সমাপনী বক্তব্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, পরিবর্তনের সুযোগ এলেও তা ধরে রাখা কঠিন। তাই সংস্কার বাস্তবায়নে নাগরিকদের সংগঠিত থাকা অপরিহার্য।” তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুলনার এই কণ্ঠস্বরই জাতীয় ‘নাগরিক ইশতেহার’ গঠনে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
Leave A Comment